শেয়ার বাজারে নতুন? এই ৫টি জিনিস না জেনে বিনিয়োগ করবেন না
বাংলাদেশে শেয়ার বাজার নিয়ে মানুষের মনে দুই ধরনের ধারণা আছে। এক, এখানে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যায়। দুই, এখানে টাকা ঢুকালে সব শেষ।
দুটোই ভুল।
শেয়ার বাজার হলো একটা বৈধ বিনিয়োগের জায়গা যেখানে সঠিক জ্ঞান আর ধৈর্য থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই জ্ঞান ছাড়া ঢুকলে ক্ষতি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আজকে সেই বেসিক জ্ঞানটুকু দেব যেটা প্রতিটা নতুন বিনিয়োগকারীর জানা উচিত।
১. শেয়ার বাজার আসলে কী?
সহজ ভাষায়, শেয়ার বাজার হলো এমন একটা জায়গা যেখানে বিভিন্ন কোম্পানির মালিকানার একটা অংশ (শেয়ার) কেনাবেচা হয়।
আপনি যখন একটা কোম্পানির শেয়ার কেনেন, তখন আপনি সেই কোম্পানির একজন আংশিক মালিক হয়ে যান। কোম্পানি লাভ করলে আপনিও লাভবান হন, ডিভিডেন্ড পান অথবা শেয়ারের দাম বাড়ে।
বাংলাদেশে দুটো স্টক এক্সচেঞ্জ আছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)। DSE ই প্রধান, বেশিরভাগ ট্রেডিং এখানেই হয়।
এখানে যেসব জিনিস ট্রেড হয়:
- ইকুইটি শেয়ার (কোম্পানির মালিকানা)
- ডিবেঞ্চার (কোম্পানির ঋণপত্র)
- মিউচুয়াল ফান্ড
- কর্পোরেট বন্ড
২. শুরু করতে কী কী লাগে?
অনেকে ভাবেন শেয়ার বাজারে ঢুকতে লাখ লাখ টাকা লাগে। আসলে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা দিয়েও শুরু করা যায়।
শুরু করার জন্য আপনার লাগবে:
BO (Beneficiary Owner) অ্যাকাউন্ট: এটা আপনার শেয়ার রাখার অ্যাকাউন্ট। ব্যাংকে যেমন টাকা থাকে, BO অ্যাকাউন্টে তেমন শেয়ার থাকে।
ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট: এটা দিয়ে আপনি কেনাবেচা করেন।
ব্রোকারেজ হাউসে অ্যাকাউন্ট: ব্রোকার হলো আপনার আর স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে মিডলম্যান। BSEC (Bangladesh Securities and Exchange Commission) অনুমোদিত ব্রোকার থেকে অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে।
দরকারি কাগজপত্র:
- জাতীয় পরিচয়পত্র
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট
- TIN সার্টিফিকেট (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার)
৩. ব্রোকার বাছাই করবেন কিভাবে?
ভালো ব্রোকার বাছাই করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভুল ব্রোকার ধরলে কমিশনে টাকা গলবে, সার্ভিস পাবেন না, আর ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম কাজ করবে না ঠিকমতো।
ব্রোকার বাছাইয়ের সময় যা দেখবেন:
কমিশন রেট: প্রতিটা ট্রেডে ব্রোকার একটা কমিশন কাটে। সাধারণত ০.৩০% থেকে ০.৫০% হয়। কম কমিশন মানে আপনার লাভ বেশি থাকবে।
ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম: ভালো ব্রোকারের অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম থাকে যেখানে মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে ট্রেড করতে পারবেন। প্ল্যাটফর্ম যদি স্লো হয় বা ক্র্যাশ করে, তাহলে সঠিক সময়ে কেনাবেচা করতে পারবেন না।
রিসার্চ সাপোর্ট: কিছু ব্রোকার মার্কেট অ্যানালাইসিস, কোম্পানি রিপোর্ট, আর বিনিয়োগ পরামর্শ দেয়। নতুনদের জন্য এটা খুব কাজের।
BSEC লাইসেন্স: অবশ্যই চেক করুন ব্রোকারের BSEC লাইসেন্স আছে কিনা। বিনা লাইসেন্সে ব্রোকারেজ করা অবৈধ।
৪. কোন শেয়ার কিনবেন?
এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। আর এখানেই বেশিরভাগ নতুন বিনিয়োগকারী ভুল করেন।
যা করবেন না:
- বন্ধু বা আত্মীয়ের “টিপস” ফলো করবেন না
- সোশ্যাল মিডিয়ায় কারো “এই শেয়ার কিনুন” পোস্ট দেখে কিনবেন না
- দাম বাড়ছে দেখে ভিড়ে যোগ দেবেন না
যা করবেন:
ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিস: কোম্পানির আর্থিক অবস্থা দেখুন। আয়, লাভ, ঋণ, ডিভিডেন্ড হিস্ট্রি চেক করুন। DSE এর ওয়েবসাইটে প্রতিটা লিস্টেড কোম্পানির আর্থিক তথ্য পাওয়া যায়।
P/E Ratio দেখুন: Price-to-Earnings Ratio বলে দেয় শেয়ারটা সস্তা নাকি দামি। সাধারণত P/E ১৫ এর নিচে থাকলে সেটা তুলনামূলক সস্তা ধরা হয়। তবে এটা সেক্টর ভেদে আলাদা হয়।
ডিভিডেন্ড হিস্ট্রি: যেসব কোম্পানি নিয়মিত ডিভিডেন্ড দেয়, সেগুলো সাধারণত বেশি স্থিতিশীল। নতুনদের জন্য ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানি ভালো অপশন।
সেক্টর বুঝুন: বাংলাদেশে ব্যাংকিং, ফার্মাসিউটিক্যাল, টেলিকম, পাওয়ার সেক্টরের কোম্পানিগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল।
৫. রিস্ক ম্যানেজমেন্ট
শেয়ার বাজারে গ্যারান্টেড রিটার্ন বলে কিছু নেই। দাম বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। তাই রিস্ক ম্যানেজ করা শেখাটা বিনিয়োগ করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সব টাকা এক জায়গায় রাখবেন না: এটাকে বলে ডাইভার্সিফিকেশন। ৫-১০টা বিভিন্ন সেক্টরের কোম্পানিতে বিনিয়োগ ভাগ করুন। একটা কোম্পানি ক্ষতি করলেও বাকিগুলো সামলে নেবে।
যত টাকা হারালে সমস্যা হবে না, তত টাকাই রাখুন: টাকা ম্যানেজমেন্ট এর প্রথম নিয়ম হলো কখনোই জরুরি তহবিল বা দৈনন্দিন খরচের টাকা শেয়ার বাজারে ঢুকাবেন না।
স্টপ লস ব্যবহার করুন: মনে মনে ঠিক করুন, একটা শেয়ারের দাম কত কমলে আপনি বিক্রি করে দেবেন। সাধারণত ১০-১৫% লস হলে বের হয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আবেগে ধরে রাখলে লস আরো বাড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে ভাবুন: শেয়ার বাজারে স্বল্পমেয়াদে অনেক ওঠানামা হয়। কিন্তু ৫-১০ বছর ধরে ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ঐতিহাসিকভাবে রিটার্ন ভালো হয়।
মিউচুয়াল ফান্ড: নতুনদের জন্য নিরাপদ অপশন
যদি নিজে শেয়ার বাছাই করতে ভয় পান বা সময় না থাকে, তাহলে মিউচুয়াল ফান্ড ভালো অপশন।
মিউচুয়াল ফান্ডে আপনি টাকা দেন, একজন প্রফেশনাল ফান্ড ম্যানেজার সেই টাকা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। আপনাকে রোজ মার্কেট ফলো করতে হয় না।
বাংলাদেশে বেশ কিছু ভালো মিউচুয়াল ফান্ড আছে। ICB, AIMS, LankaBangla এর মিউচুয়াল ফান্ড বেশ জনপ্রিয়।
নতুনদের জন্য ৫টি টিপস
প্রথম ৩ মাস শুধু শিখুন: অ্যাকাউন্ট খুলে সাথে সাথে কেনাবেচা শুরু করবেন না। DSE এর ওয়েবসাইটে ফ্রি লার্নিং রিসোর্স আছে, সেগুলো পড়ুন।
ছোট অ্যামাউন্ট দিয়ে শুরু করুন: ৫,০০০-১০,০০০ টাকা দিয়ে শুরু করুন। ভুল করলেও বড় ক্ষতি হবে না। অভিজ্ঞতা বাড়লে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ান।
ডায়েরি রাখুন: প্রতিটা কেনাবেচার কারণ লিখে রাখুন। পরে দেখবেন কোন সিদ্ধান্ত ভালো ছিল আর কোনটা ভুল। এভাবে শেখার গতি অনেক বাড়ে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন: মার্কেট পড়ে গেলে ভয়ে সব বিক্রি করবেন না। আবার মার্কেট বাড়লে লোভে সব টাকা ঢুকাবেন না। ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিন।
নিয়মিত বিনিয়োগ করুন: প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করুন, মার্কেট যেমনই থাকুক। এটাকে বলে Dollar Cost Averaging। দীর্ঘমেয়াদে এটা সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি।
শেষ কথা
শেয়ার বাজার ভয়ের জায়গা না, যদি আপনি জেনে বুঝে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু না জেনে ঢুকলে এটা জুয়ার চেয়েও খারাপ হতে পারে।
আজকে থেকে শেখা শুরু করুন। BO অ্যাকাউন্ট খুলুন। ছোট অ্যামাউন্ট দিয়ে শুরু করুন। আর ধৈর্য রাখুন।
প্যাসিভ ইনকাম তৈরি করতে চাইলে শেয়ার বাজার অন্যতম সেরা অপশন। কিন্তু সেটা রাতারাতি হবে না। ৫-১০ বছরের প্ল্যান করুন, তাহলে ফলাফল আসবেই।







